‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্থবহ করতে প্রয়োজন কার্যকর গণতন্ত্র’

‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্থবহ করতে প্রয়োজন কার্যকর গণতন্ত্র’

আলোচিত মাজদার হোসেন মামলার রায় ঘোষণার ৮ বছর পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ কার্যকর হয়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নেওয়া যুগান্তকারী এই পদক্ষেপের পর ৯ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে রায়ে দেওয়া ১২ দফা নির্দেশনার আলোকে কিছু বিষয় বাস্তবায়িত হয়েছে, কিছু বিষয় এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ৯ বছর পূর্তিতে মাজদার হোসেন মামলার রায়ের মৌলিক অংশের কতটুকু বাস্তবায়ন হলো তা নিয়ে গত তিন দিন ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম। বিভাগ পৃথকীকরণ কার্যকরের সময় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন।

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ বিষয়টি কার্যকরের ৯ বছর পর জনগণ তার সুফল কতটা পাচ্ছে, তা নিয়ে সম্প্রতি দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মইনুল হোসেন বলেন, ‘কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না।’

মইনুল হোসেন ১৯৪০ সালের জানুয়ারি মাসে বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার ভাই আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বর্তমান সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। মইনুল হোসেন ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়তে যান এবং মিডল টেম্পল ইন (বার অ্যাট-ল সনদ প্রদানকারী ইংল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠান)-এ ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি লাভের পর ওই বছরই দেশে ফিরে ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ১৯৬৯ সালে পিতার মৃত্যুর পর ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ে তার কাঁধে। ১৯৭৩ সালে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া-কাঁঠালিয়া এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে সামরিক আইন জারির পর ১৯৭৬ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কারাভোগ করেন তিনি।

মইনুল হোসেন দ্য ডেইলি নিউ ন্যাশন নামে একটি ইংরেজি পত্রিকাও প্রকাশ করেন। পাশাপশি তিনি সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি ও প্রেস কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ২০০০-২০০১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে যে ৩১ জন বুদ্ধিজীবী আহ্বান জানিয়েছিলেন, তার মধ্যে তিনি একজন।

দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের নিজস্ব প্রতিবেদক খাদেমুল ইসলাম-এর নেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

দ্য রিপোর্ট : পৃথকীকরণের ৯ বছর পর সত্যিকার অর্থে বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন হতে পেরেছে?

মইনুল হোসেন : দেখেন, আইনত (বিচার বিভাগ) স্বাধীন করা হয়েছে। কিন্তু এটাকে স্বাধীন রাখার যে ব্যবস্থা, সেটা তো করা হয়নি। অর্থাৎ বিশেষ করে হাইয়েস্ট কোর্টের (উচ্চ আদালতের) স্বাধীনতার ব্যাপারটা চিন্তায় ছিল। লোয়ার কোর্ট (নিম্ন আদালত) সুপ্রিম কোর্টের অধীনে থাকবে, এটা নির্বাহী বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আগে ল’ মিনিস্ট্রি (আইন মন্ত্রণালয়) নিয়ন্ত্রণ করতো, হোম মিনিস্ট্রিও (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) কিছুটা করত। আইনত হয়ে গেছে স্বাধীন। কিন্তু এই স্বাধীনতাটাকে কার্যকর করার জন্য যেটা করা দরকার সেটা করা হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এখনো রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ হচ্ছে। আমরা যারা তখনকার কেয়ারটেকার সরকারে ছিলাম, তখন বলেছিলাম বিচারপতিরা স্বাধীনভাবে একটা কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হবে। সেই কমিশনটা রাখা হয়নি। আরেকটা কথা হলো, আমাদের ব্যবস্থাটা আছে কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না। যেমন ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে জামিন পাওয়াটাকে মনে করা হয় এটা একটা অপরাধ। জামিন দেওয়া হবে না, এটা তো কোনো কথা না। বিচার না হওয়া পর্যন্ত সে নির্দোষ। কিন্তু কোর্ট জামিন দিলেই এটা মনে হয় একটা অন্যায় করছে। অর্থাৎ বিচার হওয়ার আগেই তাকে জেল খাটতে হবে। এটা তো কথা না। আরেকটা হলো রিমান্ড। কেন রিমান্ডে নেওয়া হবে? আইনে আছে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ার জন্য কেউ ফোর্স করতে পারবে না। সেখানে আমাকে একা একা রিমান্ডে নিয়ে যেকোনো ধরনের ব্যবহার আমার সঙ্গে করতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে হলে জেলখানায় প্রথম করো এবং ল’ইয়ার থাকবে সেখানে। রিমান্ড সঙ্গে সঙ্গে দিবা না। মানা হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্ট থেকে বলা হয়েছে, ওয়ারেন্ট ছাড়া অ্যারেস্ট করবা না, সেটা কেয়ারই করা হচ্ছে না।

দ্য রিপোর্ট : ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে মাজদার হোসেন মামলার রায়ে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। রায়ের পর দুটি রাজনৈতিক সরকার তাদের সময়ে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পদক্ষেপ নেয়নি, সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যাদের সংবিধান অনুযায়ী রুটিনমাফিক কাজ করার কথা ছিল, তারা কেন এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে গেল?

মইনুল হোসেন : যেহেতু আমি আইনজীবী ছিলাম, তাই উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আরেকটা বিষয়-কেয়ারটেকার সরকার হলেও আমরা কিন্তু তিন মাসের কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট ছিলাম না। কারণ আমাদেরটা গণতন্ত্র রক্ষার কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট ছিল, আমি বলব। নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারছিল না, ভোটার লিস্ট তৈরি করতে পারছিল না, নির্বাচন কমিশন করতে পারছিল না। অতএব আমরা সেই তিন মাসের কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট ছিলাম না। আমাদের দুই বছরের জন্য থাকতে হয়েছে, এ সমস্ত কাজ করার জন্য। ফলে আমাদের কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট সম্পর্কে যেটা বলা হয় যে আপনাদের কাজ ছিল শুধু দৈনন্দিন কাজ, এটা বললে তো হবে না। আমরা চেয়েছি গণতন্ত্রকে সফল করার জন্য। সেজন্য আমরা নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন করেছি, দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করেছি, নির্বাচন কমিশনের সেক্রেটারিয়েট করে দিয়েছি, ভোটার লিস্ট করেছি, স্বচ্ছ ব্যালট বক্স তৈরি করেছি। এগুলো করতে হয়েছে আমাদের। যাতে গণতন্ত্র কাজ করতে পারে। আমরা শুধু নির্বাচনের জন্য যাইনি, আমরা চেয়েছি নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার হোক। আমরা তখনই বলেছি গণতন্ত্রকে ইনস্টিটিউশনাল রূপ দেওয়ার জন্য আমরা কাজ করব।

দ্য রিপোর্ট : আইনতগতভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য আর কি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের বাকি আছে?

মইনুল হোসেন : আইনের কোনো দরকার নাই, শুধু মানুষজনকে আর সরকারকে আইনের শাসনে বিশ্বাস করতে হবে। যদি সংসদ গণতান্ত্রিক পন্থায় ঠিকমতো কাজ করতে পারে, তখনই আইনের শাসন কাজ করতে পারে।

দ্য রিপোর্ট : বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্পর্ক কতটুকু?

মইনুল হোসেন : স্বাধীন বিচার বিভাগ গণতন্ত্রের সঙ্গে অবশ্যই সম্পর্কিত। কার্যকর গণতন্ত্র ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না। আমি তো বললাম আইনত বিচার বিভাগকে স্বাধীন করলেন, অথচ (উচ্চ আদালতে) বিচারক নিয়োগ করবেন রাজনৈতিক বিবেচনায়। তাহলে কেমন করে স্বাধীন বিচার বিভাগ কাজ করবে? তারপর দল নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্টের দ্বারা আপনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বিচার করতে চাইবেন, তাহলে কেমন করে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে? বিচারপতিদের তো পুলিশ বিভাগ নাই, তাদের অর্ডার তো সরকারের মাধ্যমেই মানতে হবে। অতএব এমন সরকার থাকতে হবে যারা জনগণের নিকট দায়িত্বশীল। গণতন্ত্র তো ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে না, এটা একটা সামগ্রিক ব্যাপার। আর আমি বলেছিলাম এক হাউসের পার্লামেন্ট বিচারপতিদের (অসদাচরণের) বিচার করতে পারে-এমন উদাহরণ দেখান, দেখাতে পারে নাই। ইউকে (যুক্তরাজ্যে) তে হাউস অব লর্ডস ও হাউস অব কমন্স দুটোতে করতে হয়।

দ্য রিপোর্ট : সরকারের সদিচ্ছাটাকেই কি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন?

মইনুল হোসেন : সদিচ্ছা না, আমি সিস্টেমটাকে কার্যকর করার কথা বলছি। আমার কথা হবে, গণতান্ত্রিক সিস্টেমটাকে মেনে চলতে হবে সকলকেই।

দ্য রিপোর্ট : সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয়ের কথা বলা হয়েছিল সেটি এখনো হয়নি, এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

মইনুল হোসেন : নিশ্চয়ই, সেটা বলা আছে। আমার বক্তব্যেও আছে। আমরা সময় পাই নাই এটা করতে। এটা না করলে হবেই না, এটা থাকতেই হবে। নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে যদি ল’ মিনিস্ট্রি যদি কাজ করে, তাহলে তো বিচার বিভাগ স্বাধীন হলো না। এটা করতেই হবে।

দ্য রিপোর্ট : নিম্ন আদালতের বিচারক নিয়োগের জন্য যে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন আছে এর কার্যক্রমকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মইনুল হোসেন : এটা লোয়ার কোর্টে আছে, এটা আমাদের আগেই হয়েছিল।

দ্য রিপোর্ট : উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের নিয়োগের জন্য আপনারা যে কমিশন করেছিলেন সেটা পরে কি হয়েছে?

মইনুল হোসেন : সেটা পরবর্তী সরকার রাখে নাই।

দ্য রিপোর্ট : ফৌজদারি কার্যবিধি যেটুকু সংশোধনের কথা যেটুকু বলা হয়েছিল, সেটা কি হয়েছে?

মইনুল হোসেন : সুপ্রিম কোর্ট এসবের ব্যাখ্যায় বলেছে, কাউকে সরাসরি অ্যারেস্ট করা যাবে না। সেটিসফেক্টরি ফাস্ট, এটা আমার সময়ে করে দিয়ে আসছিলাম। এফআইআর করলেই মানুষকে অ্যারেস্ট করবা না। দেখবা ঘটনার সত্যতা আছে কি না। এখন তো এফআইআরও করা লাগে না।

দ্য রিপোর্ট : আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পার্থক্য কেমন?

মইনুল হোসেন : ইন্ডিয়ার সঙ্গে তুলনাই করবেন না, ইন্ডিয়াতে জুডিশিয়ারি স্বাধীন। সেখানে একটা প্রাইম মিনিস্টার যা চায় সেটা করতে পারে না। সংবাদপত্রকে সহজে টাচ করতে পারে না। পাকিস্তানের কথা বলতে পারেন সেখানে একটা যুদ্ধাবস্থায় আছে, টেররিজম আছে, পাকিস্তান তো নষ্ট হয়ে গেছে।

দ্য রিপোর্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মইনুল হোসেন : আপনাকেও ধন্যবাদ।

(168) বার এই নিউজটি পড়া হয়েছে




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE