জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ‘শিফা গার্ডেন’

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ‘শিফা গার্ডেন’

সবুজ বনায়ন ও বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থলে পরিণত
সবুজ অরণ্য। চারিদিকে চোখ জুড়ানো গাছপালা। পাখির কোলাহল। পাহাড়ের উপর, ঢালু এমনকি সমতল ভূমিও ভরে গেছে গাছে গাছে। আকাশচুম্বী গাছ যেমন রয়েছে। তেমনি রয়েছে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী বিভিন্ন জাতের উদ্ভিদও। কক্সবাজারের সব জায়গায় এমন চিত্র দেখা না গেলেও টেকনাফের শামলাপুরে তার বাস্তব প্রমাণ মিলেছে। উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে প্রকৃতির বন্ধু হয়ে ন্যাড়া পাহাড়ের ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনেছেন এক যুবক। প্রকৃতির অনিন্দ সুন্দর এ বাগান এখন ভূমিকা রাখছে সবুজ বনায়ন, বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল ও বেকারের কর্মসংস্থান হিসেবে।
শামলাপুর বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার পূর্বে পাহাড়ের গহীনে চোখ জুড়ানো বাগান। প্রায় ৬শ’ বিগা জমির উপর গড়ে এ বাগানে আমের পাশাপাশি রয়েছে কাঁঠাল, পেয়ারা, লেবু, আমলকি ও জলপাই গাছ। ২০০৩ সালে ২২ হাজার চারা রোপণ করে বিশাল বাগান তৈরির এ মহৎ কাজটি করেছেন হাবিব উল্লাহ হাবিব। দেশের সর্ব দক্ষিণ সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের অজপাড়া গা বাহারছড়া ইউনিয়নের এক তরুণ উদ্যোক্তা তিনি। যেটির নাম দেয়া হয়েছে ‘শিফা গার্ডেন’।
বাগানের উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী হাবিব উল্লাহ হাবিব জানান, উপকূলীয় অঞ্চল হিসেবে টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুরে অসংখ্য বেকার যুবক রয়েছে। যারা কাজ না পেয়ে বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হয়। এছাড়াও দেখলাম যে, দিন দিন যখন বনভূমি অবৈধ দখলে চলে যাচ্ছে। আর পাহাড় হয়ে পড়ছে বৃক্ষ শূণ্য। ফলে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। এসব বিষয় মাথায় রেখে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অর্থায়নে বাগান সৃজনে নেমে পড়ি।
বাগান সৃজনে কিভাবে উৎসাহিত হলেন-এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ছোট বেলা থেকে বাবার আদেশ ছিল গাছ রোপণ করার। মূলত পিতার আদর্শে উজ্জীবিত হয়েই প্রকৃতি রক্ষায় বাগান সৃজনের উদ্যোগ নিই।
তিনি আরও বলেন, এক সময়ের ন্যাড়া পাহাড় গুলো এখন সবুজ বনায়নের রূপ নিয়েছে। যা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে পাহাড় তার যৌবন-জীবন ফিরে পেয়েছে। ”
“এখন এ বিশাল বাগান পরিচর্যায় কাজ করছে ৪০ জন শ্রমিক। যারা মাসিক/দৈনিক ভিত্তিতে পারিশ্রমিক নেন। আর এ টাকা দিয়েই তাদের সংসার চালায়।” যোগ করেন তিনি হাবিব।
বাগান সৃষ্টির পর এখানে হরিণ, বানর, হাতি, শেয়াল সহ নানা ধরণের প্রাণীর আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
বাগান সৃজনের পর আর্থিক লাভবানের ব্যাপারে তিনি জানান, “গত ৫ বছর ধরে তিনি বছরে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকার আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আমলকি ও জলপাই বিক্রি করেন। যে গুলো তিনি বাগানের পরিচর্যা ও শ্রমিকদের বেতন দেন।
দীর্ঘ সময় ধরে শ্রম ও সাধনায় গড়ে উঠা বাগানে বিচরণকারী প্রাণীরা ফলমূল খেয়ে জীবন ধারণ করে।
বাগানে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ১০/১২ জন নারী-পুরুষ বাগানের পরিচর্যা করছেন। তাদের কেউ মাসিক বেতন। কেউ দৈনিক মজুরীতে।
হাবিব উল্লাহ হাবিব জানান, এক সময় পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন পাহাড় কেটে সাবাড় করতো। আর এখন তারাই পাহাড় ও সবুজ বনায়নের পাহারাদার। তারা এখন আর গাছ কাটেনা। কেননা বাগানটি তাদেরকে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
তরুণ উদ্যোক্ত হাবিব দুঃখ প্রকাশ করে জানান, “পরিত্যক্ত অনাবাদী পাহাড়ী জমিকে আবাদী করে বাগান সৃজন করেছি। নিজস্ব অর্থায়নে বাগান করেছি। ৩০ টি পরিবার চলছে এ বাগানের আয় দিয়ে। অথচ কোন মহলই আমাকে সহযোগিতার হাত বাড়াননি।”
তিনি আরো বলেন, “দেশের নানা প্রান্তে ক্ষমতা আর অর্থের দাপট দেখিয়ে প্রভাবশালীরা অনেকে বহু বনভূমি দখল করে নিয়েছে। আর আমি বাগান সৃজন করে বনভূমি রক্ষার পাশাপাশি বেকার যুবকের কর্মংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। বাগানে ইতোমধ্যে কয়েক লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে।
উদ্যোক্তা হাবিব মনে করেন, “এলাকায় বেকারত্ব দূর করতে তরুণদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে তরুণকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে সকলকে। এজন্য বাগানকে আরো ব্যাপকভাবে সাজাতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারী-বেসরকারী কোন ব্যাংক যদি আমাকে কৃষি ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করেন। তাহলে আমার পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিবে এবং আরো বহু বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।”

(197) বার এই নিউজটি পড়া হয়েছে




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE