আত্মহত্যার পিছনের কথা

আত্মহত্যার পিছনের কথা

মো: আরিফ উল্লাহ :
আত্মহত্যা বলতে বুঝায় আপন হাতে নিজের জীবন কে ধ্বংস করার মাধ্যমে পৃথিবীর সকল কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা,যা খুবই যন্ত্রনাদায়ক । সাধারনত নিজেকে নিজে হত্যা করাকেই আত্মহত্যা বলে। মানুষ যখন আশাহীন হইয়ে পড়ে তখন ই সে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। হতাশা আর বীষন্নতার কাছে এ যেন অসহায়, সে ভুলে যায় যে, সে দেশের সম্পদ, দেশের প্রতি তার পরিবারের প্রতি তার ও কিছু দায়-দায়ীত্ব ও অধিকার রয়েছে । বিভিন্ন কারণে মানুষ আত্মনাশের পথ বেছে নেয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, কোনো কাজে ব্যর্থ হাওয়া, ব্যবসায়ে ক্ষতি সাধন, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হাওয়া, প্রেমে ব্যর্থতা ইত্যাদি। দুঃখজনক বিষয় হল এই আত্মহরণ রোগে আজ সারা বিশ্ব আক্রান্ত, কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, ছাত্র-ছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী , শিক্ষিত – অশিক্ষিত, ধনী – গরিব সবাই।
“WHO” (World Health Organization) এর মতে প্রতি বছর প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ আত্মহত্যার কারণে মারা যায়, আর প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১, ০০,০০০ মানুষের মধ্যে ১৬জন মানুষের মৃত্যু ঘটে যা ২০২০ সাল নাগাত বৃদ্ধি পেয়ে ২০ সেকেন্ডে দাড়াবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার মানুষ আত্মনাশের পথ বেছে নেয়। বাংলাদেশ পুলিশ হেড় কোয়াটারের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৯৫৪২ জন আত্মহরণের মাধ্যমে মারা যায়।
আমরা হাসি – ঠাট্টা বা রাগের মাথায় প্রায়শই বলে থাকি ” তোমার মতো ছাত্রের বেচে থাকার দরকার নেই, আপনার মতো মানুষের জন্য চাকরি আসেনি, এই টুকো কাজ ও যদি না হয় তবে গলায়দড়ি দেন, আর যদি এটাও না হয় বিষ খান,” রাগের মাথায় শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রী কে, দেনাদার পাওনাদার কে, অফিসের বস তার জুনিয়র কে এমন কথা বলেই থাকে, কিন্তু তার এই কথা গুলি যে ঐ ব্যক্তিকে আরো হতাশায় নিমজ্জিত করে এই দিক টি কেউ ভাবে এবং একটি সময় সে আত্মনাশের পথ বেছে নেয়।
এমতাবস্থায় আমাদের উচিত তাদেরকে সাহস যোগান , অনুপ্রেরণা প্রদান এবং তাদের একাকীত্ব অনুভব করতে না দেয়া, সব সময় হাসি খুশি রাখা। তাদেরকে এটা বুঝানো যে, প্রতিটি সমস্যা আমাদের জন্য কিছু না কিছু শিক্ষনীয় ও একাধিক সফলতার দার নিয়ে আসে। আর এ সময় আমাদের প্রধান কাজ হলো সেই সফলতার দার খোজে বের করা এবং জীবন কে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সর্বোপরি সমস্যা মোকাবিলা করার মানষিকতা গড়ে তুলা কারণ আল্লাহ তার বান্দাদের খুব বেশি ভালবাসেন ।
আত্মহত্যা এমন এক অপরাধ যা, কোন ধর্ম এবং কোন আইন তা সর্থন করেনা, বরং এটি একটি দন্ডনীয় অপরাধ ধর্মীয় আইন এবং দেশীয় আইন উভয় ক্ষেত্রেই। আমাদের দেশীয় আইনে এই অপরাধে অপরাধি ও অপরাধ করায় সাহায্যকারীর জন্য বিভিন্ন ধরনের সাজার বিধান রয়েছে। যেমন;
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ধারা ৯ক, এতে বলা হচ্ছে নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা, ইত্যাদির শাস্তি: কোন নারীর সম্মতি ছাড়া বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তির ইচ্ছাকৃত (Wilful) কোন কার্য দ্বারা সম্ভ্রমহানি হইবার প্রত্যক্ষ কারণে কোন নারী আত্মহত্যা করিলে উক্ত ব্যক্তি উক্ত নারীকে অনুরূপ কার্য দ্বারা আত্মহত্যা করিতে প্ররোচিত করিবার অপরাধে অপরাধী হইবেন এবং উক্ত অপরাধের জন্য তিনি অনধিক দশ বত্সর কিন্তু অন্যুন পাঁচ বত্সর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷। দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৩০৬ ধারা অনুসারে, কোন ব্যক্তি যদি আত্মহত্যা করে, তবে যে ব্যক্তি আত্মহত্যা সহায়তা বা প্ররোচনা দান করবে, উক্ত ব্যক্তি ১০ (দশ) বছর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবে, এবং তদুপরি অর্থ দন্ডেও দন্ডিত হবে। আর দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৩০৯ ধারা অনুসারে কোন ব্যক্তি যদি আত্নহত্যা করার চেষ্টা করে এবং আনুরূপ অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে কোন কার্য করে, তবে উক্ত ব্যক্তি ১ (এক) বছর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদন্ডে অথবা অর্থ উভয়দন্ডেই দন্ডিত হবে। এ হচ্ছে আমাদের দেশের আইনের বিধান, কিন্তু দেশের সর্ব বৃহৎ ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যা হচ্ছে মুসলিম, আর ইসলাম ধর্ম ও এই অপরাধটির ঘোর বিরোধী। আল্লাহ সুবহানাহু অতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন ;সূরা নিসার ২৯ ও ৩০ নম্বর আয়াতে বলা হইয়েছে,”হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না,কিন্তু পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে তোমাদের মধ্যে ব্যবসা বৈধ এবং তোমরা নিজেদের হত্যা করো না,আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়াময়।” (২৯) “এবং যে কেউ সীমালংঘন করে এবং অন্যায়ভাবে তা করবে,সে শিগগিরই আগুনে দগ্ধ হবে। আল্লাহর পক্ষে এটা খুবই সহজ।”(৩০)
আত্মনাশ কখনো কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারেনা, আপনার বাবা, শিক্ষক, বা অফিসের সিনিয়র আপনাকে কিছু বলেছেন তার অর্থ এই নয় যে সে আপনাকে তুচ্ছার্থে বলেছেন, বরং সে আপনাকে এই কারণে বলেছেন কারণ তিনি আপনার প্রতি আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী, এবং হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল কারিম (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি যে ভাবে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ঐ কাজ (একই ভাবে আত্মহত্যা) করতে থাকবে। যে নিজেকে নিক্ষেপ করার মাধ্যমে আত্মহত্যা করে সে সব সময় জাহান্নামে নিক্ষেপ হতে থাকবে। যে বিষপান করল সে বিষপান করতে থাকবে। ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করলো, জাহান্নামে সে ধারালো অস্ত্র থাকবে যার দ্বারা সে সর্বদা নিজের পেটকে ফুঁড়তে থাকবে। এখানেই শেষ নয় ইসলাম ধর্ম অনুসারে প্রত্যেক মুসলিমই শাস্তিভোগের পর জান্নাতে প্রবেস করবে কিন্তু কোনো আত্মহত্যাকারী ব্যক্তি কখনো জান্নাতে প্রবেস করতে পারবে না।
সুতরাং আত্মহরণ কে না বলি, প্রতিটি সমস্যার উত্তম সমাধান খোজে বের করি, নিজের ধর্ম, দেশ ও দেশের আইন কে সম্মান করি, সুন্দরভাবে জীবন যাপন করি।

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ (প্রথম ব্যাচ), কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
arifcbiu@gmail.com

 

(138) বার এই নিউজটি পড়া হয়েছে




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE